:

রক্তের বিনিময়ে বিষ: সীমান্তে খাদ‌্যের পরিবের্ত আসছে মরণনেশা ইয়াবা-আইস

top-news

মিয়ানমারের রাখাইনে বাংলাদেশের চাল, ডাল আর সিমেন্টের গোপন সরবরাহ; অন্যদিকে সেই নৌকো ফিরছে এক বিষাক্ত কার্গো নিয়ে—যা ধীরে ধীরে নিভিয়ে দিচ্ছে দেশের কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ।

সীমান্তজুড়ে এখন আর শুধু কাগজের টাকা কিংবা হুন্ডির হাতবদল ঘটছে না; চাল, ডাল কিংবা ইলিশের বিনিময়ে সরাসরি দেশে ঢুকছে প্রাণঘাতী ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)। এই সর্বনাশা ‘নার্কো-কারেন্সি’ বা মাদক-মুদ্রার জালে আটকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশের যুব সমাজ। যে তরুণদের কাঁধে ভর দিয়ে দেশের আগামী গড়ে ওঠার কথা, মরণনেশার নীল ছোবলে তাদের স্বাস্থ্য, মেধা, মানসিক স্থায়িত্ব ও পারিবারিক স্বপ্নগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮২ থেকে ৮৫ লাখ, যার ৮০ শতাংশই ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-যুবক। দেশের ১৮টি জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ঢল নামছে কোটি কোটি টাকার মাদকের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের দুর্গম নৌপথ।

কেবল গত এক বছরেই জব্দ হয়েছে রেকর্ড ৪ কোটি ৩৫ লাখের বেশি ইয়াবা ও আইস—যা আগের বছরের তুলনায় ৯০.৫৮ শতাংশ বেশি!

কিন্তু যা ধরা পড়ছে, তা প্রবেশের সামান্য অংশ মাত্র। রাজধানীর ২৩ লাখ মাদকসেবীসহ সারাদেশের উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা আজ ফ্যাটি লিভার, হূদ্রোগ, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি ও তীব্র বিষণ্নতার মতো জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। বহু সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ অকালেই ঝরে যাচ্ছে, আর বহু পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে চিকিৎসার খরচ সামলাতে গিয়ে।

এই ভয়াবহ সীমান্ত বাণিজ্যের লাগাম টানতে গিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে কোটি কোটি টাকার সিমেন্ট ও ডিজেলসহ পাচারকারীদের গ্রেফতার করলেও কৌশলে পথ বদলে নিচ্ছে পাচারকারী সিন্ডিকেট।

সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে মাছের ট্রলারের তলদেশ, এমনকি রোহিঙ্গাদের পেটের ভেতর বা যানবাহনের গোপন স্থান। তবে সীমান্ত বাণিজ্যের অসাধু চক্র, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এই মরণনেশার পথকে এখনো সচল রেখেছে বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

শুধুমাত্র সীমান্ত পাহারায় কড়াকড়ি নয়; দরকার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, আধুনিক শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ‘নার্কো-কারেন্সি’ কেবল জাতীয় নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলবে না, একটি পুরো প্রজন্মকে পঙ্গু করে জাতিকে ঠেলে দেবে অন্ধকারের অতল গহ্বরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *